গল্প খুঁজুন (Search Stories)

ভৌতিক

ছায়ামহলের অসম্পূর্ণ পান্ডুলিপি

📅 August 5, 2026 ⏱️ 6 min read 👁️ 28 times read

আন্ধারমানিক গ্রামটার নাম কেন আন্ধারমানিক, তা সেখানে পা না দিলে বোঝা যায় না। ঘন শাল আর শিমুল বনে ঘেরা গ্রামটিতে বেলা চারটে বাজতেই যেন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে। সেই গ্রামের একদম শেষ মাথায়, নদীঘেঁষা টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছায়ামহল। বাড়িটার বয়স প্রায় দেড়শো বছর। লাল ইটগুলো শ্যাওলায় কালো হয়ে গেছে, খিলানওয়ালা জানালার কাঁচগুলো ভাঙা, আর চারপাশ ঘিরে আছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

সৌমেন এখানে এসেছে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে। পুরোনো জমিদারি আমলের দোতলা এই বাড়িটির শেষ মালিক ছিলেন জমিদার রতিকান্ত রায়। লোকমুখে শোনা যায়, রতিকান্ত বাবু সাধারণ জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষ এবং তন্ত্রশাস্ত্রের গভীর চর্চাকারী। ১৯২৩ সালের এক অমাবস্যার রাতে নিজের খাসকামরায় একা বসে কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে যান। তার লাশের কোনো সন্ধান মেলেনি, মেলেনি কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্র। শুধু সেই ঘরের মেহগনি কাঠের টেবিলে পড়ে ছিল একটি অর্ধেক লেখা পান্ডুলিপি।

গ্রামের বৃদ্ধ হরেন কাকা সৌমেনকে পেয়িং গেস্ট হিসেবে নিজের বাড়িতে জায়গা দিয়েছিল, কিন্তু ছায়ামহলে যাওয়ার কথা শুনে শিউরে উঠেছিল। সে স্পষ্ট বারণ করে বলেছিল, দিনদুপুরে ওই বাড়িতে গেলে ক্ষতি নাই, কিন্তু সূর্য ডুবার আগেই যেন ফিরবা। রতিকান্ত বাবুর সেই কাজ আজও শেষ হয় নাই। যে-ই ওই কাজ শেষ করতে গেছে, সে আর আন্ধারমানিক থ্যাইকা ফিরা যায় নাই। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছাব্বিশ বছরের তরুণ সৌমেন এসব সংস্কারে কান দেওয়ার পাত্র ছিল না।

বিকাল তিনটা নাগাদ সৌমেন ছায়ামহলের দোতলার প্রধান লাইব্রেরি কামরায় ঢোকে। পুরোনো আসবাবপত্রগুলোর ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ জমা হয়ে আছে। বাতাসে শুকনো কাঁচা কাগজের গন্ধ আর ভ্যাপসা আর্দ্রতা। লাইব্রেরির এক কোণে একটি বড় মেহগনি কাঠের বন্ধ দরজা ছিল, তাতে ঝূলছিল একটি বড় তামার তালা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হরেন কাকা যে পুরোনো চাবির গোছাটা তাকে দিয়েছিল, তার মধ্যে একটা চাবি অদ্ভুতভাবে এই তালায় মিলে যায়। ক্লিক করে শব্দ হতেই ভারী তালাটা খুলে আসে সৌমেনের হাতে।

দরজাটা খুলতেই একঝলক বরফ-শীতল বাতাস আছড়ে পড়ে সৌমেনের মুখে। ঘরের ভেতরে দিনের বেলাতেও যেন অমাবস্যার ঘন অন্ধকার জমা হয়ে আছে। রুমের মাঝখানে একটা বড় সেগুন কাঠের টেবিল রাখা। টেবিলের ওপর একটি পিতলের হারিকেন, এক শিশি কালচে লাল রঙের কালি, একটি কাঠের ফাউন্টেন পেন এবং ঠিক মাঝখানে খোলা রয়েছে মোটা চামড়ায় বাঁধানো রতিকান্ত রায়ের সেই বিখ্যাত পান্ডুলিপি।

সৌমেন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে টর্চের আলো ফেলে খাতার ওপর। হাতে লেখা বাংলা হরফগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুসংবদ্ধ। সেখানে বিভিন্ন দুর্লভ ভেষজের গুণাগুণ এবং অশরীরী শক্তির সাথে যোগাযোগের এক অদ্ভুত পদ্ধতির কথা লেখা আছে। কিন্তু পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেষ পাতায় গিয়ে সৌমেনের হাত থমকে যায়। শেষ পাতার ঠিক মাঝামাঝি এসে লেখাটি হঠাৎ আটকে গেছে। সেখানে লেখা ছিল, আজ অমাবস্যার গভীর প্রহরে সাধনার দ্বাদশ ধাপ পূর্ণ হইতে চলিল। আর মাত্র তিনটি বাক্য লিখিলেই দ্বার উন্মুক্ত হইবে এবং তিনি জাগ্রত হইবেন। তিনি ঠিক আমার পিঠের পেছনে আসি সমাসীন হইয়াছেন, আমি তাঁহার শ্বাস-প্রশ্বাসের হিম শীতল অনুভাব বুঝিতে পারিতেছি। তিনি আমাকে বলিয়াছেন, আমি যদি হস্ত না চালাই, তবে তিনি আমার...। বাক্যটি এখানেই অসমাপ্ত। কোনো দাড়ি বা কমা নেই, শুধু কালির এক ফোঁটা দাগ খাতার গায়ে শুকিয়ে কালো হয়ে আছে।

ঠিক এই সময়ে বাইরে একটা তীব্র শব্দে বাজ পড়ে। সৌমেন চমকে উঠে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখে, কখন যে বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে আর আকাশ কালো হয়ে দিন নিভে গেছে, সে খেয়ালই করেনি। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। বাড়ি ফেরা দরকার ভেবে সে যখন ঘর থেকে বের হতে যাবে, অমনি প্রকাণ্ড মেহগনি কাঠের দরজাটা সশব্দে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। সৌমেন ছুটে গিয়ে হাতল ধরে টানাটানি করলেও দরজাটি ইঞ্চিমাত্র নড়ে না।

টর্চের আলোটা মিটমিট করে নিভে এলে সৌমেন বাধ্য হয়ে টেবিলের ওপর থাকা পুরোনো হারিকেনটা জ্বেলে দেয়। হলদেটে আলোয় ঘরটা ভরে উঠতেই সৌমেন অনুভব করে তার পিঠের পেছনে এক অসম্ভব ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ। ঠিক যেন কেউ বরফ-শীতল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে তার ঘাড়ের কাছে। একই সাথে, এক শতবর্ষ প্রাচীন কাঠের চেয়ার টেনে বসার মড়মড় শব্দ শুনতে পায় সে, যদিও ঘরের মধ্যে সে ছাড়া দৃশ্যমান আর কেউ ছিল না।

হারিকেনের কাঁপতে থাকা আলোয় সৌমেন দেখে, টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কালির ফাউন্টেন পেনটি কোনো দৃশ্যমান হাত ছাড়াই শূন্যে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তা চামড়ায় বাঁধানো খাতার পাতায় নিজে থেকেই চলতে শুরু করে। নিস্তব্ধ ঘরে শুধু কাগজ আর নিবের ঘর্ষণের খসখস শব্দ হতে থাকে। সেই অদ্ভুত শক্তি পান্ডুলিপির অসমাপ্ত বাক্যটিকে এগিয়ে নিয়ে লেখে যে, তবে তিনি আমার প্রাণ হরণ করিবেন। আমি আর লিখিতে পারিলাম না, আমার হস্ত অবশ হইয়া আসিতেছে। কিন্তু এই কার্য অসম্পূর্ণ রাখা চলিবে না। যে মানব এক শতাব্দী পর এই কক্ষে প্রবেশ করিবে, এই কার্য শেষ করার দায়িত্ব তাহার হস্তেই ন্যস্ত হইল।

লেখাটি শেষ হতেই কলমটি মেঝের ওপর পড়ে যায়। একই মুহূর্তে সৌমেন অনুভব করে, তার নিজের ডান হাতটা মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এক অদৃশ্য শক্তি জোর করে তার আঙুলগুলোকে দিয়ে সেই ফাউন্টেন পেনটি তুলে নেয়। সৌমেনের হাত পান্ডুলিপির ওপর চেপে বসে এবং সে নিজের অজান্তেই লিখতে বাধ্য হয়, আমি সজ্ঞানে এই দ্বারে শেষ চাবিটি প্রদান করিতেছি।

প্রথম বাক্যটি শেষ হওয়ার পর শুরু হয় শেষ বাক্য লেখার পালা। সৌমেনের হাত কাঁপতে কাঁপতে লিখতে শুরু করে, তিনি এখন...। কিন্তু শেষ শব্দটি শেষ করার ঠিক আগের মুহূর্তে ছায়ামহলের ছাদের ওপর প্রচণ্ড শব্দে কালবৈশাখীর বাজ আছড়ে পড়ে। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর তীব্র সাদা আলোয় ঝলসে ওঠে, আর সৌমেনের হাত থমকে যায়। যন্ত্রণায় এবং গভীর আতঙ্কে সৌমেনের চেতনা হারিয়ে যেতে থাকে। চোখ বুজে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে সে শুনতে পায় এক অতি বৃদ্ধ ও ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরের নিরাশ বিলাপ, আবার অসম্পূর্ণ রয়ে গেল? আবার হাত স্তব্ধ হয়ে গেল?

পরদিন সকালে যখন হরেন কাকা এবং গ্রামের লোকেরা ছায়ামহলের বন্ধ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে, তখন তারা সৌমেনকে মেঝের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তার ডান হাতের আঙুলগুলো অদ্ভুতভাবে বাঁকা এবং শক্ত হয়ে ছিল, যেন সে কোনো অদৃশ্য বস্তুকে আঁকড়ে ধরেছিল। জ্ঞান ফেরার পরও সৌমেন আর কোনো দিন একটি শব্দও বলতে পারেনি, তার দৃষ্টি চিরদিনের জন্য স্থির হয়ে যায়।

আজও আন্ধারমানিকের সেই ছায়ামহলের দোতলার ঘরটি আগের মতোই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। অমাবস্যার রাতে শিমুল বনের বাতাস থমকে গেলে বহুদূর থেকেও শুনতে পাওয়া যায় পুরোনো খাতার ওপর ফাউন্টেন পেনের সেই শুকনো খসখস শব্দ। রতিকান্ত বাবুর সেই পান্ডুলিপির শেষ বাক্যে আজও লেখা আছে কেবল দুটো শব্দ, "তিনি এখন..."। সেই রহস্যময় কাজ আজও শেষ হয়নি, হয়তো অপেক্ষা করছে অন্য কোনো পথিকের জন্য।

💬 পাঠকদের মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!