রাত বারোটা পাঁচ।
আনিস টেবিল ল্যাম্পের আলোয় একটা বই পড়ছিল। বইয়ের পাতা উল্টাতে যাবে, এমন সময় তার পুরনো নকিয়া ফোনটা কেঁপে উঠল। মৃদু একটা 'টুং' শব্দ।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে অচেনা একটা নম্বর। আনিস মেসেজটা খুলল। সেখানে লেখা:
“আজও কি ছাদে যাবে না? নীল শাড়িটা পরে বসে আছি।”
আনিস কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্পষ্টতই ভুল নম্বর। হয়তো কোনো ব্যাকুল প্রেমিকা তার খামখেয়ালী প্রেমিককে পাঠাতে গিয়ে ভুলবশত এই নম্বরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
আনিসের উচিত ছিল মেসেজটা চোখ বুজে ইগনোর করা, অথবা একটা ভদ্র টাইপ 'ভুল নম্বর' লিখে পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু আনিস মানুষটা স্বাভাবিকদের মতো নয়। তার মাথায় হঠাৎ এক অদ্ভুত খামখেয়ালিপনা চেপে বসল।
সে টাইপ করল:
“মেঘ করেছে, বৃষ্টি নামলে নামব।”
মেসেজ সেন্ড হতেই আনিস মনে মনে একটু হাসল। ভাবল, মেয়েটা হয়তো এবার ভুল বুঝতে পেরে চটে গিয়ে একটা ধমক দেবে, কিংবা আর কোনো উত্তরই দেবে না।
কিন্তু মিনিট দুয়েকের মধ্যেই রিপ্লাই এল:
“বৃষ্টি তো নামছে না। তবে বাতাস ছাড়ছে। তুমি কি সত্যি আসবে না?”
আনিস এবার সোজা হয়ে বসল। চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে টাইপ করল:“হুট করে ছাদে চলে গেলে রহস্য থাকে না। তাছাড়া নীল শাড়িতে তো তোমাকে নিশ্চয়ই খুব অন্যরকম লাগছে, তাই না?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর ভেসে উঠল:
“তুমি তো কখনো আমাকে নীল শাড়িতে দেখনি। আজকে প্রথম পড়লাম। আব্বু আজ সন্ধ্যায় উপহার দিয়েছে। তুমি কী করে জানলে আমাকে অন্যরকম লাগছে?”
আনিস জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সত্যি সত্যি একটা মিষ্টি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। দূর থেকে আম গাছের পাতার খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে লিখল:“কিছু জিনিস না দেখেও বোঝা যায়। যেমন আমি না দেখেও বলতে পারি, তোমার কপালে ছোট একটা কালো টিপ আছে। আর তুমি এখন খালি পায়ে ছাদে হাঁটাচলা করছ।”
“অদ্ভুত! টিপটা তো সত্যি কালো! কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে? তুমি কি আমার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছ নাকি?”
আনিস মনে মনে হাসল। আন্দাজে গুলি ছুড়েছিল, লেগে গেছে। সে আবার লিখল:
“আমি বাসার নিচে নেই। আমি আকাশের মেঘের ওপর বসে আছি। তুমি কি চা খাও?”
“এই অসময়ে চা? না, আমি চা খাই না। তবে এখন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি হলে মন্দ হতো না। চিনি ছাড়া কফি।”
“চিনি ছাড়া কফি খাওয়া মানুষগুলো একটু জটিল প্রকৃতির হয়। তোমার নাম কি?”
মেসেজ পাঠানোর পর আনিস অপেক্ষা করতে লাগল। ওপাশ থেকে বেশ কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। আনিস ভাবল, খেলা হয়তো এখানেই শেষ। মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে সে কোনো অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলছে।
ঠিক দশ মিনিট পর স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল:“নাম জেনে কী হবে? নাম বলে দিলে তো মানুষটা সাধারণ হয়ে যায়। অচেনা থাকার মধ্যে এক ধরণের স্বাধীনতা আছে, তাই না?”
আনিস মেসেজটা পড়ে মুগ্ধ হলো। বলল:
“ঠিক বলেছ। তাহলে তুমি আজ থেকে 'নীল শাড়ি'। আর আমি?”
“তুমি হচ্ছো 'মেঘের ওপর বসে থাকা মানুষ'।”
সে রাতে আর ঘুমানো হলো না।
ঘড়ির কাঁটা রাত একটা, দুটো, তিনটে পেরিয়ে চারটের দিকে ছুটল। তাদের কথা থামলই না। তারা কেউ কাউকে চেনে না, কোনোদিন দেখেনি। শহরটা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সম্পূর্ণ দুজন অচেনা মানুষ মেসেজের ছোট ছোট অক্ষরে নিজেদের নিঃসঙ্গতা শেয়ার করে নিতে লাগল।
মেয়েটা জানাল সে ছাদে তারা গুনতে ভালোবাসে, কিন্তু ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। আনিস জানাল সে পুরোনো বইয়ের গন্ধ ভালোবাসে, আর রাত তিনটের পর যখন পুরো পৃথিবী শান্ত হয়ে যায়, তখন তার মনে হয় সে একটা রূপকথার রাজ্যে বাস করছে।
ভোর চারটে বেজে পঁচিশ মিনিট। পুব আকাশে হালকা আলোর আভা ফুটতে শুরু করেছে।
হঠাৎ আনিসের ফোনে আবার মেসেজ:“শোনো, আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। নীল শাড়ির জাদুটাও হয়তো একটু পর কেটে যাবে। কিন্তু আমার একটা সত্যি কথা জানতে ইচ্ছে করছে।”
আনিস লিখল: “বলো।”
“তুমি তো আমার আসল পরিচিত মানুষটা নও, তাই না? আমি যাকে ভেবে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম, সে কখনো এতো সুন্দর করে কথা বলে না। সে কখনোই বলবে না যে মেঘের ওপর বসে আছি।”
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যিটা স্বীকার করার সময় এসেছে। সে টাইপ করল:
“হ্যাঁ, আমি সে নই। ভুল নম্বরে মেসেজটা এসেছিল।”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর উত্তর এল:
“আমি প্রথম কয়েকটা মেসেজের পরেই বুঝেছিলাম। কারণ সে আমাকে কখনো 'তুমি' করে বলে না। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় কি জানো?”
“কী?”
“এই ভুলটাই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভুল মনে হচ্ছে। শুভরাত্রি, মেঘের ওপর বসে থাকা মানুষ।”
আনিস জানালার দিকে তাকাল। সত্যি সত্যি টিপটিপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে।
আনিস ফোনটা হাতে নিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল। তার হঠাৎ মনে হলো, আজ তাকেও নীল শাড়ির মতো কেউ একজন বৃষ্টিতে ভিজতে ডেকেছে—এমনকি সে ডাকটা যদি একটা ভুল মেসেজ থেকেও এসে থাকে, তবুও।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!